চরফ্যাশন(ভোলা)প্রতিনিধি ॥
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চারটি থানার বিভিন্ন ইউনিয়নের ঘনবসতি এলাকায় গড়ে উঠেছে ৩৩টি ইটের ভাটা। কর্তাবাবুদের ম্যানেজ করে প্রভাবশালীদের গড়ে তোলা এসব ইটের ভাটার নেই কোন নিয়মনীতি। সরকারী নিয়ম নীতিকে উপেক্ষা করে এসব ৩৩ ইটভাটার মধ্যে ১৬ টি ইট ভাটায় সিমিত সংখ্যক ইট পোড়ানোর অনুমোদন থাকালেও ১৭টি ইট ভাটার নেই কোন অনুমোদন।বছর ঘুরে ইট পোড়ানোর সময় এলে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময় অবৈধ ইটভাটার বৈধতা নিয়ে শুরু হয় ইট পোড়ানোর কর্মযজ্ঞ। কাঠ পোড়ানোর বিশাল কর্মযজ্ঞের ফলে উজার হচ্ছে সবুজ বেস্টুনী। পাশাপাশি উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী খ্যাত ম্যানগ্রোভ বাগান উজার করে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ আছে, উপজেলা ও জেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্তাদের‘ম্যানেজ’ করেই অবৈধ ইটভাটাগুলো বছরের পর বছর ধরে বীরদর্পে অপকর্ম করেই যাচ্ছে। অবৈধ ইটভাটার দাপটে উজার হচ্ছে উপকূলের সবুজ বেষ্টনী পাশাপাশি ফসলী জমির মাটির সয়েল যাচ্ছে ইটভাটায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। উজার হচ্ছে ফসলী জমি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চরফ্যাসন উপজেলার ২১টি ইউনিয়নে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে গড়ে উঠা ৩৩টি ইটভাটার মধ্যে ১৬টির নাম মাত্র অনুমোদন ইট পোড়ানো হয়। বাকি ১৭টি ইটভাটার কোন অনুমোদন নেই। কিছু সংখ্যক ইটভাটা ইটের চিমিনি ব্যবহার করে জিগজ্যাগ দাবী করলেও নেই ইট পোড়ানোর অনুমোতি বা লাইন্সেস।
অপর ১৭টি ইটভাটায় ৩০/৪০ ফুট ড্রাম চিমনি ব্যবহার করে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরে নাম মাত্র আবেদন ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেডলাইসেন্স নিয়ে ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর ধুম চলছে।অনুমমোদিত ১৭টি ইটভাটা ছাড়া বাকি ভাটাগুলোর কোনোটিই নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে না। জ্বালানী হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ভাটাগুলোর সবই স্থাপিত হয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কৃষি জমি এবং ম্যানগ্রোভ বাগানের নিকটবর্তী স্থানে। এছাড়াও রয়েছে পর্যটন এলাকা, স্কুল , শহর রক্ষাবাধ প্রকল্প ঘেষে গড়ে তোলা এসব ইট ভাটার কারনে বিপর্যয় ঘটছে জনস্বাস্থ্যের। এতে সাবার হচ্ছে ফসলী জমি।বেশিরভাগ ভাটাগুলো লোকালয়ে অবস্থিত হওয়ায় এবং ব্যারেল চিমনি ব্যবহার করায় ওই সব এলাকার পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।
সরেজমিনে বেতুয়া প্রশান্তি পার্ক ও এওয়াজুপর , আসলামপুর, নীলকমল, আহম্মপপুর ইউনিয়নসহ তেঁতুলিয়া নদীর পাড় এলাকায় পশ্চিম ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকায় ঘনবসতী এলাকায় গড়ে উটেছে অসংখ্য ইটভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী ১২০ ফুট চিমনি থাকার কথা থাকলেও ৩০/৪০ ফুটের চিমনির চুল্লি দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে ইট। এছাড়াও ওই ভাটাটি কৃষি জমিতে গড়ে উঠায় কৃষকের ফসলী জমি কেটে তৈরি হচ্ছে ইট। এতে উজার হচ্ছে ফসলী কৃষি জমি। পাশাপাশি ভাটার চুল্লির ফুলকিতে পুড়ে যাচ্ছে কৃষককের ফসল ও ভাটা সংলগ্ন মানুষের বাড়ির গাছ গাছালি। ঘনবসতি এলাকায় ইটভাটা গড়ে উঠায় বিপাকে পড়েছেন ওই এলাকার হাজার হাজার পাবিরার।
মালিকরা জানান,নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু করে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভাটায় ইট পোড়ানোর মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। সাধারনত ১ চিমনির একটি ভাটায় এক মৌসুমে ২৭ থেকে ২৮ লাখ ইট তৈরি হয়।আর দুই চিমনির ভাটায় এক মৌসুমে ৫০ লাখ পর্যন্ত ইট তৈরি করা সম্ভব। এক লাখ ইট তৈরিতে কাঁঠ লাগে ২ হাজার মণ। সেই হিসেব অনুযায়ী উপজেলার ইটভাটাগুলোতে কোটি কোটি মণ কাঠ পোড়ানো হয়। তবে প্রকৃত হিসেব এর চেয়ে অনেক বেশি বলে জানা যায়। ইটভাটা মালিকেরা কয়েক দফা আবেদন করলেও পরিবেশ আইন বহিভূত বিধায় অনেক ইটভাটায় অনুমোদন নিতে পারেননি বলেই কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইটভাটা মালিক জানান, প্রতি বছর ইট পোড়ানোর মৌসুমের শুরুতে আমরা ভাটা মালিক সমিতির মধ্যমে প্রশাসনকে ম্যানেজ করতে টাকা দিয়ে থাকি। এতে ইটা পোড়াতে আমাদের কোন সমস্যা হয়। এমনকি হয়না কোন অভিযান। টাকা দিলে সকল অবৈধই বৈধ হয়ে যায়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চরফ্যাসনে ৩৩টি ইটভাটার মধ্যে ১৭টি ইট ভাটা জনবসতিপূর্ণ কৃষি জমি, ম্যানগ্রোভ বাগানের নিকটবর্তী অবস্থান এবং টিন, ব্যারেল,ইট, বালি ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি নিষিদ্ধ চুল্লি ব্যবহার করা সহ নানান অনিয়ম বিদ্যমান থাকায় অনুমোদন বিহীন ইটভাটার মালিকরা কয়েক দফা আবেদন করলেও পরিবেশ আইন বহির্ভূত বিধায় অনুমোদন মেলেনি।
তারপরও অনুমোদন বিহীন এসব ইটভাটা মালিকারা পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের কর্তবাবুদের উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। এবং কিছু ভাটা মালিক পরিবেশ অধিদপ্তরে কোন আবেদন বা অনুমতি না নিয়ে গড়ে তুলেছেন ইটভাটা।
স্থানীয় বাসিন্ধাদের অভিযোগ, ঘনবসতি এলাকার ইটভাটা গুলো স্থপিত হওয়ায় পুড়ছে বসত বাড়ির গাছ-গাছালি। নষ্ট হচ্ছে কৃষকের আবাদী ফসল। কৃষকের খামার। ইট তৈরির কাজে ব্যবহার হচ্ছে কৃষি জমির মাটি। এতে সংকটে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এছাড়া কালো ধোঁয়ার কারণে মানুষের ফুসফুসের সমস্যা, শ্বাসকষ্টসহ নানান রোগ দেখা দিয়েছে।
চরফ্যাসন উপজেলা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সালাম হোসেন জানান, ইট ভাটা গুলো নিয়ন্ত্রন করে জেলা প্রশাসক। এখানে আমাদের কোন হাত নাই। ম্যানগ্রোভ বাগানের কাঠে ইটভাটায় পোড়ানো হচ্ছে খবর এমন পাইনি। গত বছর একটি ভাটায় পেয়েছি সেটিতে আমারা অভিযান চালিয়েছি।
পরিবেশ অধিদপ্তর ভোলার সহকারি পরিচালক মো.তোতা মিয়া জানান ,আমাদেরকে ম্যানেজের অভিযোগ সঠিক নয়। প্রতিবছর অভিযানকালে নিয়মানুযায়ী ভাটা তৈরি এবং পরিচালনা করার নির্দেশনা দিয়ে অবৈধ ভাটা বন্ধসহ জরিমানা করা হলেও তারা নিয়মের মধ্যে আসছেন না। চলতি মৌসুমে একাধিক ভাটায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার এমাদুল হোসেন বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো ধরনের ইটভাটা পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করব।
