চরফ্যাশনে অনিয়ম ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য বিএনপি’র সাবেক নেতার

সারাদেশ

ভোলা প্রতিনিধি॥
ভোলার চরফ্যাসনের অনিয়ম ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন বহিস্কৃত সাবেক সাধারন সম্পাদক বিএনপি নেতা মোতাহার হোসেন আলমগীর মালতিয়া। আওয়ামী সরাকার পতনের পরপরই নিজকে বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক পরিচয় দিয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে নিজের ক্ষমতার বলয়ে এডিবির অর্থায়নে পাকা হলো বিএনপি নেতার উঠান পাকা করন ও মডেল মসজিদের সীমানাপ্রাচীরের গ্রীল অপসারণ করে নিজের মালিকানাধীন ভবন নির্মাণ এবং তার তার ক্ষতার অপব্যবহার করে চরফ্যাসন মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন তার ছেলে। এছাড়াও একটি প্রকল্পের কাজ না করেই অর্থ ছাড় দিতে ইউএনওকে চাপ দেন আলমগীর মালতিয়া। এমন সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জানাযায়, উপকূলীয় এলাকার শহরগুলোতে জলবায়ূ পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবিলায় অবকাঠামো নির্মাণ খাতে অর্থায়ন করেছে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক- এডিবি। বাংলাদেশ সরকার ও এডিবির যৌথ উদ্যোগে সিটিসিআরপি প্রকল্পের আওতায় উপকূলীয় শহরের সড়ক ড্রেনেজ ও পৌর নাগরিক সুবিধা উন্নত করতে প্রতিটি পৌরসভায় অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় সেই বরাদ্দের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে নিজের বাড়ির উঠান ও প্রবেশ পথ পাকা করেছেন ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার বিএনপি নেতা মোতাহার হোসেন আলমগীর মালতিয়া। পৌরসভার সংশিষ্ট সূত্রের তথ্য পর্যলোচনা পর সরেজমিন এ তথ্যের সত্যতা মিলেছে।
এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অধীন বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩৩ লাখ টাকার অপর একটি কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের চেষ্টা এবং সংশিষ্ট কর্মকর্তার ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে এই নেতার বিরুদ্ধে। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাশনা শারমিন মিথি অর্থ ছাড়া করতে অপারগতা প্রকাশ করলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেন এই নেতা। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সাথে বিরোধে জড়ায় আলমগীর মালতিয়ার অনুসারীরা।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের ভদ্রপাড়া মালতিয়াবাড়ি সড়ক ও স্টেডিয়ামসংলগ্ন সংযোগ সড়ক নির্মাণে ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও সড়ক পাকা কাজ বন্ধ রেখে ঠিকাদারকে জিম্মি করে নিজের বাড়ির প্রবেশ পথ এবং উঠান পাকা করেন বিএনপি নেতা আলমগীর মালতিয়া। ফলে সড়ক দুটি এখনো সংস্কার না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পৌরবাসী।
ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পৌর প্রশাসনে জিম্মি করে ভয়াবহ দুর্নীতির আশ্রয় নেন এই নেতা। প্রকল্প বাস্তবায়নকানে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশ না করে এসব তথ্য জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে চরফ্যাসন মডেল মসজিদের সীমানা প্রাচীরের গ্রীল অপসারণের অভিযোগও রয়েছে এই নেতার বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা জানান, আলমগীর মালতিয়া তার ব্যক্তিগত ভবন নির্মাণের সময় উপজেলা মডেল মসজিদের সীমানা প্রচীরের গ্রীল খুলে ফেলেন। ফলে বর্মতানে প্রচীর ধ্বসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয় মুসল্লীরা জানান তার এই স্বেচ্ছাচারিতা ও বেআইনী কাজের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করলেও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
এছাড়াও এই বিএনপি নেতার ছেলে আরাফাত রহমানের বিরুদ্ধেও সরকারি প্রকল্পে অর্থ তছরুপের অভিযোগ রয়েছে। চরফ্যাসন মিনি স্টেডিয়াম মির্মাণ কাজে ঠিকাদারকে জিম্মি করে নিজেই প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করেন। এই কাজে মিন্মমানের উপকরণ ব্যবহার করে প্রায় ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঠিকাদারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনিও কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেতাহার হোসেন আলমগীর মালতিয়া। তার অনুসারীরা পুরো উপজেলায় ত্রাস সৃষ্টি করে দখল ও চাঁদাবাজি শুরু করলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সূত্রগুলোর পক্ষ থেকে বিষয়টি বিএনপির হাইকান্ডের দৃষ্টিতে আনা হয়। একই সাথে তার দখল-চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা বিএনপির কমিটি বাতিল করে বিএনপি।
উপজেলা যুবদল নেতা সায়েম মালতিয়া জানান, ১৯৯৩ সালের উপ-নির্বাচনেবিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। যা এখনো প্রত্যাহার হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। পরবর্তিতে তিনি কিভাবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হলেও তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দেন এবং জাতীয় নির্বাচনেও অংশ নেন বলে জানান তিনি।
নাম প্রকাশ না করে উপজেলা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, পদ হারিয়ে আলমগীর মালতিয়ার দাপট কিছুটা কমলেও কিছুদিন পরই তিনি ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করায় তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান এই বিএনপি নেতা।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো, শামিম হাসান জানান, কাজ না করে বিল নেয়ার কোন সুযোগ নেই। বিএনপি নেতার বাড়ির যে দরজা পাকা করা হয়েছে সেটার কোন টেন্ডারই হয়নি। ঠিকদারকে জোর করে তিনি কাজ করিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার জানান, কাজী মানর হোসেন জানান, স্টডিয়ামের পিছনের সড়কের তিনি ঠিকাদার নিযুক্ত ছিলেন। বিএনপি নেতা তার সড়কের কাজ বন্ধ করে দিয়ে ক্ষমতার দপট দেখিয়ে জোর পুর্ব আমাকে দিয়ে তার বাড়ির দরজা ও উঠানের পাকা করনের কাজ করিয়েছেন। তার অনিয়মের কারনে আমি এখন ওই কাজের কোন বিল পাইনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে আলমগীর মালতিয়ার মুঠোফোনে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাশনা শারমিন মিথি জানান, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি অনেকের কাজ হাতিয়ে নিয়ে কাজ না করে বিল তুলে নিতে চেয়ে ছিলেন কিন্ত আমি কোন বিল স্বাক্ষর করিনি। আমার বদিলির পরে কি হয়েছে তার আমার জানা নাই।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুমনা আফরোজ জানান,আমি সদ্য চরফ্যাসনে সদ্য যোগদান করেছি, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মনজুর হোসেন জানান, বিএনপি কোন নেতা কর্মীর অপকর্মের দায় নেয়না। আর মোতার হোসেন আলমগীর মালতিয়া তো চরফ্যাসন উপজেলা বিএনপির কেউ নন। তিনি বহু আগেই বিএনপি থেকে বহিস্কার হয়েছে। বিএনপির না ভাঙ্গিয়ে অপকর্ম করলে তাকে ছাড় দেয়া হবেনা।
ছবি: এটাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *